সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

1960-Frank-Worrell.jpg

১৯৬০ সাল রোমাঞ্চকর এক ম্যাচের গল্প

এটাই টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম টাই। টেস্টের জন্মের প্রায় ৮৪ বছর পরে। এই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জয়ী নয়। নয় ওয়েস্ট ইন্ডিজও। এই টেস্টে জয়ী দলের নাম ক্রিকেট।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য অনেকেই কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন ক্লাইভ লয়েডকে। কিন্তু প্রথম যে মানুষটি দ্বীপগুলোকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন তাঁর নাম ওরেল। ফ্রাঙ্ক ওরেল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের তিন বিখ্যাত ‘ডব্লু’র একজন। বাকি দুজনের নাম এভার্টন উইকস এবং ক্লাইড ওয়ালকট।

১৯৬০ সালে শেষের দিকে ৫ ম্যাচের এক টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া গেলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেটি ছিল ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফির প্রথম আসর। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঐ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাপ্টেন ছিলেন ফ্রাঙ্ক ওরেল নিজেই। কোন খেলোয়াড় অবসর নেওয়ার আগেই তাঁর নামে কোন ট্রফির নামকরণ সম্ভবত এটাই প্রথম।

প্রথম টেস্ট ছিল ব্রিসবেনের গ্যাবাতে। কে জানতো, প্রথম সিরিজের প্রথম টেস্টই এতো রোমাঞ্চ উপহার দেবে?

টসে জিতে ব্যাটিং নিলো ফ্রাঙ্ক ওরেলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্যার গ্যারির সেঞ্চুরি আর ওরেল, সলোমন, হল আর আলেকজান্ডারের হাফ সেঞ্চুরিতে প্রথম ইনিংসে ৪৫৩ রানের একটা মোটাসোটা সংগ্রহ দাঁড় করায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ৫ উইকেট নেন অ্যালান কিথ ডেভিডসন। এই ভদ্রলোকের কথা মাথায় রাখুন। এই টেস্টের গল্পে ভদ্রলোকের একটা বড় ভূমিকা আছে।

জবাব দিতে নেমে নর্ম ও’নীলের ১৮১ আর বব সিম্পসনের ৯২’এর কল্যাণে ৫০৫ রানের পর্বতে উঠে যায় অস্ট্রেলিয়া। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যার ওয়েস হল নেন ৪ উইকেট।

৫২ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ডেভিডসনের রুদ্রমূর্তিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ গুটিয়ে যায় মাত্র ২৮৪ রানে। ডেভিডসন একাই নেন ৬ উইকেট। প্রথম ইনিংসে ৫২ রানের লিডের কারণে টার্গেট দাঁড়ায় ২৩৩ রান।

নাকউঁচু হিসেবে ব্রিটিশদের কুখ্যাতি আছে। সম্মান দেওয়ায় তাদেরকে ‘মার্চেন্ট অব ভেনিসের’ শাইলকের কাছাকাছি রাখা যায়। তারাই যখন কাউকে নাইটহুড উপাধি দেয়, সেই ব্যক্তি যে আসলেই সেটার যোগ্য তা নিয়ে সন্দেহ থাকে না। তাইতো ওয়েস হল নামক এক ম্যাজিশিয়ান তাঁর টুপির ভিতর থেকে জাদুর কৌশল বের করতে থাকলেন প্রতিনিয়ত। ডেভিডসন যেখানে শেষ করেছিলেন, স্যার ওয়েস হল যেন শুরু করলেন সেখান থেকেই। ২৩৩ রানের টার্গেটে এক পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর হয়ে গেলো ৫৭/৫। হল কি পরিমাণ বিধ্বংসী ছিলেন তা বোঝা যাবে একটা তথ্যেই। ৫ উইকেটের ৪টিই ছিল তাঁর।

গ্রীক মিথোলজিতে বর্ণিত আছে ‘একিলিস বনাম হেক্টরের’ যুদ্ধের কথা। এই ম্যাচ যেন হয়ে উঠতে লাগলো ‘হল বনাম ডেভিডসনের’ এক টুকরো লড়াই। অ্যালান কিথ ডেভিডসন যেন প্রতিজ্ঞা করলেন এই ম্যাচ তিনি একা হাতে জেতাবেন। কিন্তু তা বললেই তো হয় না। একজন সঙ্গী তো লাগেই। ৯২ রানে যখন ৬ষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে ম্যাকে যখন আউট হলেন, জয়ের জন্য তখনো লাগে ১৪১ রান। ব্যাট করতে নামছেন শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান রিচি বেনো।

রিচি বেনোকে সঙ্গে নিয়ে অসম্ভব এক জয়ের উদ্দেশ্যে ছুটতে লাগলেন ডেভিডসন। সপ্তম উইকেটে তখনকার রেকর্ড ১৩৪ রানের এক অসাধারণ জুটি গড়ে দলকে নিয়ে গেলেন ২২৬ রানে।

এরপরেই ব্যক্তিগত ৮০ রানে আউট হয়ে গেলেন ডেভিডসন। কিন্তু তাঁর উইকেটটা নিলো... দুর্ভাগ্য। নিছকই দুর্ভাগ্য। রান আউট হলে এ ছাড়া আর কিইবা বলা যায়?

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের ধড়ে কি একটু প্রাণ ফিরে এলো?

ম্যাচ তখনো হেলে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার দিকে। রান লাগবে মাত্র ৬। হাতে আছে ৩ উইকেট। তার চেয়েও বড় কথা ক্রিজে আছেন ক্যাপ্টেন রিচি বেনো।

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সময় তখন বিকাল ৫ বেজে ৫৬ মিনিট। দিনের আলো নিভে আসছে দ্রুত। শেষ দিনের শেষ ওভার করার জন্য ওরেল বল তুলে দিলেন হলের হাতে। নতুন কোন ম্যাজিকের প্রত্যাশায়।

তখন এক ওভার হত ৮ বলে। হল শেষ ওভার শুরু করতে যাওয়ার আগে সমীকরণ দাঁড়ালো এমন:

অস্ট্রেলিয়ার দরকার ৮ বলে ৬ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দরকার ৩ উইকেট। অথবা ড্র।

অথচ রেজাল্ট হল না এই ৩টার কোনটাই।

শেষ ওভারের প্রথম বল। নতুন ব্যাটসম্যান ওয়ালি গ্রাউটের থাই’এ বল লাগলো। তড়িঘড়ি করে সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক দিলেন বেনোকে। ৭ বলে দরকার ৫। হল ম্যাজিকের শেষটুকু দেখা গেলো এবার। অসাধারণ এক ডেলিভারিতে বেনোকে উইকেটের পিছনে ক্যাচ বানালেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার দরকার ৬ বলে ৫। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই উইকেট। দশম ব্যাটসম্যান হিসেবে নামলেন ইয়ান মেককিফ। তৃতীয় বল ফেস করলেন তিনি।

ডট!

৫ বলে ৫। অন্যদিকে লাগে দুই উইকেট।

চতুর্থ বল লেগ দিয়ে বের হয়ে গেলো। উইকেটকিপার আলেকজান্ডার ঝাঁপিয়ে পরে ধরে থ্রো করার আগেই এক রান। বাই।

৪ বলে ৪। দুই উইকেট।

৫ম বলে গ্রাউটের ক্যাচ উঠে গেলো স্কয়ার লেগে। কানহাই আর হলের ভুল বোঝাবুঝিতে ক্যাচ তো হলই না, উল্টে হয়ে গেলো ১ রান।

৩ বলে ৩। কিতনে আদমি সরি, কিতনে উইকেট থে? দো।

এই স্নায়ুচাপ যে অস্ট্রেলিয়ানদের গলায় ফাঁস হয়ে এঁটে বসেছে তার প্রমাণ পাওয়া গেলো পরের বলে। ৬ষ্ঠ বলে মেককিফ গায়ের জোরে ব্যাট চালালেন। ৪ হয়েই যাচ্ছিলো। সীমানা থেকে বাঁচালেন কনরাড হান্টে। বল ছোঁড়ার সময় দুই ব্যাটসম্যান দুইবার জায়গা বদল করে ফেলেছেন। স্কোর সমান। ঝুঁকি নেওয়ার কোনই দরকার ছিল না। কিন্তু ‘সাহসীরা বোকা হয়’ এটা প্রমাণ করার জন্যই যেন বল শূণ্যে থাকা অবস্থায় গ্রাউট ৩য় রান নেওয়ার জন্য দৌড় শুরু করলেন। বল উইকেটকিপার আলেকজান্ডারের হাত ছুঁয়ে যখন বেল ফেলে দিলো, গ্রাউট তখনো ক্রিজের বাইরে।

স্কোর সমান। অস্ট্রেলিয়ার জিততে ২ বলে লাগে ১ রান। ম্যাচ টাই করতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লাগে ১ উইকেট।

শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে নামলেন লিন্ডসে ক্লাইন। মেককিফ আর এই চাপ নিতে পারছিলেন না। ৭ম বল যখন ক্লাইনের ব্যাট ছুঁয়ে স্কয়ার লেগে জায়গা করে নিলো, মেককিফ, ক্লাইনকে ইশারা করলেন, দৌড়। বল তখন জো সলোমনের হাতে। জো সলোমন দাঁড়িয়ে ছিলেন মাত্র ১২ মিটার দূরে। কিন্তু আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় ৩ উইকেটকে দেখছেন ১টা।

নাটকের বাকি ছিল আরও।

সেই পড়ন্ত বিকালের আলোতে, ব্যাটসম্যান ছুটে আসছেন এমন অবস্থায় মাত্র ১২ মিটার দূর থেকে ১ উইকেট লক্ষ্য করে জো সলোমন বল ছুঁড়লেন।

বল যখন উইকেট থেকে বেল ফেলে দিলো, মেককিফ তখন মাত্র ক্রিজ থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে।

অবিশ্বাস্য! অবর্ণনীয়!! অবিস্মরণীয়!!!

এটাই টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম টাই। টেস্টের জন্মের প্রায় ৮৪ বছর পরে। এই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জয়ী নয়। নয় ওয়েস্ট ইন্ডিজও। এই টেস্টে জয়ী দলের নাম ক্রিকেট।

আর মেককিফের জানার কথা নয়, এর ৩৯ বছর পরে আরেকজন খেলোয়াড় তাঁর মতো পাগুলে দৌড় দেবেন এজবাস্টনে। সেই খেলায়ও একটা দলের নাম থাকবে অস্ট্রেলিয়া। খেলোয়াড়ের নাম হবে ল্যান্স ক্লুজনার।

ও ক্রিকেট। ইউ আর দ্য অ্যাবসোলিউট বিউটি!


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

cricket, 1960, Frank-Worrell, West-Indies, Australia, game, test, match, History