সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

team-bradman-1930.jpg

ক্যাপ্টেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ইতিহাস বদলে দেওয়া এক ম্যাচ

এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। ৬৮৯ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে ব্যাটিঙে ‘ক অক্ষর গোমাংস’ ফ্লিটউড স্মিথের দুর্দান্ত বোলিঙে ইংল্যান্ড ৩২৩ রানে অলআউট হয় । অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জেতে ৩৬৫ রানে।

ব্র্যাডম্যানের চাকরি তখন যায় যায় অবস্থা।

ক্যাপ্টেন হিসেবে প্রথম দুই টেস্ট হেরেছেন। তাও আবার অ্যাশেজে। তৃতীয় টেস্ট হারলে সিরিজ তো যাবেই সাথে ক্যাপ্টেনসিও যাবে।

এর মধ্যেই সাবেক অধিনায়ক বিল উডফুল বলে বসলেন, 'ব্র্যাডম্যান নয়, অধিনায়ক হিসেবে তাঁর পছন্দ ছিল স্ট্যানলি ম্যাককেব।'

অস্ট্রেলিয়া চাপে ছিল। কিন্তু ব্র্যাডম্যান যে তার চেয়েও বেশী চাপে ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। ‘ডু অর ডাই’ অবস্থায় খেলতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা হল খুবই বাজে। ১৩০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেললো তারা। তবে স্ট্যানলি ম্যাককেব দাঁড়িয়ে গেলেন। দলীয় স্কোর যখন ১৮১/৬, তখন আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো। যে বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা যাবে অনায়াসেই কিন্তু ক্রিকেট কখনোই নয়। তাই সেদিনের মতো খেলা শেষ হল ওভাবেই।

সেসময় বৃষ্টি নামলে তড়িঘড়ি করে পিচ ঢাকার নিয়ম ছিল না। পিচ খোলা পড়ে থাকতো। বৃষ্টির পানিতে ভেজা এই পিচকে বলা হতো স্টিকি উইকেট। এই স্টিকি উইকেট পরবর্তীতে ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে উঠতো মাইনফিল্ড। সেই মাইনফিল্ড নিতো একজন ব্যাটসম্যানের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

পরেরদিন সকালে মাঠ নামক ‘চষা ক্ষেত’ দেখে ব্র্যাডম্যানের বক্তব্য ছিল, 'দ্য ওরস্ট আই এভার স ইন মাই লাইফ।' মাঠের এই অবস্থায় খেলা শুরু হলো লাঞ্চের পরে। স্কোরবোর্ডে ২০০ উঠতেই ব্র্যাডম্যান একটা মাইন্ডগেম খেললেন। আগের দুই টেস্টে স্টিকি উইকেটে নিজেরা ব্যাট করেছেন, ইংল্যান্ডকে এই উইকেটে ব্যাটিং করানোর সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়?

ইংল্যান্ড ব্যাট করতে নামলো। পিচ মাইনফিল্ড হয়েই ছিল, তাতে গোলাবর্ষণ শুরু করলেন ‘গোলন্দাজ’ মরিস সিভারস। বলের চরিত্রের কোন আগামাথা ছিল না। ‘চরিত্রহীন’ বল। কার্ভ এবং অ্যাঙ্গেল যতরকম হতে পারে হচ্ছিল। বিখ্যাত ক্রিকেট সমালোচক নেভিল কার্ডাসের ভাষায়, 'বল ওয়াজ হেয়ার, দেয়ার, এভ্রিহয়্যার।' সিভারসের তোপে ইংল্যান্ড একসময়ে পরিণত হল ৭৬/৭।

ঠিক এই সময়ে ব্র্যাডম্যানের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। দিনের খেলা বাকি তখনো ১ ঘণ্টা। তিনি দৌড়ে গেলেন তাঁর বোলারের কাছে।

'উইকেট চাই না, সময় কাটানোর জন্য বল করো। ডেলিভারি দাও ওয়াইড দিয়ে। স্লিপ আর শর্ট লেগ সরিয়ে দিচ্ছি বাউন্ডারিতে।' 

আশ্চর্য ব্যাপার! অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেন বাগে পেয়েও ইংল্যান্ডকে অলআউট করতে চাইছেন না?

আসলে ব্র্যাডম্যান আর ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেন স্যার গ্যাবি অ্যালেনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছিল পুরোদমে। ২০০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে ব্র্যাডম্যান যদি ‘ট্রাম্প’ করে থাকেন, গ্যাবি অ্যালেন ‘ওভারট্রাম্প’ করলেন ৭৬ রানেই ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে।

দিনের খেলা শেষ হতে তখনো বাকি ৪৫ মিনিট।

সেইসময়ে ব্র্যাডম্যান যে সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে অনায়াসে সর্বকালের সেরা সিদ্ধান্ত বলা যায়। তিনি ৯ আর ১১ নাম্বার ব্যাটসম্যানকে ব্যাট করতে নামার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন।

১১ নাম্বার ব্যাটসম্যানের নাম ছিল চাক ফ্লিটউড স্মিথ। তিনি এতোটাই বাজে ব্যাটসম্যান ছিলেন যে, তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, '১০ নাম্বারে ব্যাট করতে নামা একটা অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপার।'

স্মিথ, ব্র্যাডম্যানের কথা শুনে বললেন, 'আমি কেন?'

ব্র্যাডম্যান বললেন, 'এই পিচে আউট হওয়ার একমাত্র উপায় হলো বল ব্যাটে লাগানো। যেটা তুমি একেবারেই পারো না।'

কঠিন অপমান। তবে স্মিথ এই অপমান গায়েই মাখলেন না। ভাগ্যিস মাখেননি। তাঁর ওপেনিং পার্টনারের উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া দিনশেষ করলো ৩/১ এ।

ব্র্যাডম্যানের কপালের ভাঁজ কিন্তু বড় হচ্ছিলো আরও। আবহাওয়ার পূর্বাভাস যে আরও বর্ষণের খবর দিচ্ছিলো।

পরেরদিন রবিবার ছিল ‘রেস্ট ডে’।

ব্র্যাডম্যানকে বাঁচিয়ে দিল এই রবিবার।

সোমবারে যখন অস্ট্রেলিয়া আবার ব্যাট করতে নামলো তখন আকাশের মেঘ কেটে গেছে। কেটে গেছে ব্র্যাডম্যানের মনের মেঘও। সূর্যমামা মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে এসে পিচ শুকানোর ‘মহান’ দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। তাই ২য় উইকেট হিসেবে যখন স্মিথ আউট হলেন পুরো মেলবোর্নে ‘ব্র্যাডম্যান’ ‘ব্র্যাডম্যান’ রব। কিন্তু ব্র্যাডম্যান ৪ নাম্বারে পাঠালেন কিথ রিগকে, ৫ নাম্বারে পাঠালেন বিল ব্রাউনকে। উদ্দেশ্য আর কিছুই না। ‘রান তুলতে পারলে ভালো, না হলে সময় কাটাও।’

৬ষ্ঠ এবং ৭ম ব্যাটসম্যান হিসেবে নামলেন যথাক্রমে ওপেনার জ্যাক ফিঙ্গলটন এবং ডন ব্র্যাডম্যান। স্কোর তখন ৯৭/৫। লিড ২২১ রানের।

নেভিল কার্ডাসের ভাষায়, 'খেলার তখন ক্রাইসিস পয়েন্ট। সবকিছুই নির্ভর করছিল ব্র্যাডম্যান কি করেন তার উপরে।'

ব্র্যাডম্যান করলেন। ভালমতোই করলেন। আগের রাত থেকেই ফ্লু’তে ভুগছিলেন। ফ্লু নিয়েই সেদিন শেষ করলেন ব্যক্তিগত ৫৬ রানে। পরদিন ৫৬ থেকে ১০০, ১০০ থেকে ১৫০, ১৫০ থেকে ২০০, ২০০ থেকে ২৭০ রানে ৯ম উইকেট হিসেবে যখন আউট হলেন তার আগে ফিঙ্গলটনের সাথে গড়েছেন ৬ষ্ঠ উইকেট জুটিতে রেকর্ড ৩৪৬ রানের পার্টনারশিপ। অস্ট্রেলিয়া অলআউট হল ৫৬৪ রানে।

এরপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। ৬৮৯ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে ব্যাটিঙে ‘ক অক্ষর গোমাংস’ ফ্লিটউড স্মিথের দুর্দান্ত বোলিঙে ইংল্যান্ড ৩২৩ রানে অলআউট হয় । অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জেতে ৩৬৫ রানে।

স্যার ডনের অমরত্বের পথে যাত্রাও কি শুরু হলো এই টেস্ট দিয়েই?

৪র্থ টেস্টে ব্র্যাডম্যান করলেন ২১২। ৫ম টেস্টে করলেন ১৬৯। সিরিজ নিশ্চিত হল তাতেই। এই সিরিজের ভিত্তির উপরেই পরবর্তীতে গড়ে উঠলো ‘দ্য ইনভিন্সিবল।’

২-০ তে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ এ সিরিজ জেতা একমাত্র ক্যাপ্টেন স্যার ডন।

টেক আ বাউ, স্যার। ইউ ওয়্যার নট অনলি অ্যান অসাম ব্যাটসম্যান, বাট অলসো অ্যান অ্যামেজিং ক্যাপ্টেন।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

cricket, bradman, ashes, test, glory, winning, mind, game, History, story