সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

the-elephant-year-mecca.jpg

ইতিহাসের পাতা থেকে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় - প্রথম পর্ব

চক্রান্তকারী আবরাহা এবার তার স্বপ্ন পূরণের জন্য মক্কার কা’বা ঘর ধ্বংশের নক্সা আঁকতে থাকেন। পরিকল্পনা সফল করার জন্য এবার তিনি নাজ্জাশীর দেয়া তেরটি হাতীসহ ষাট হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে যুদ্ধাভিযানের সকল আয়োজন এগিয়ে নিতে থাকেন।

আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সেই ৫২৫ খ্রীষ্টাব্দের কথা। ইয়েমেনের খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীরা তখন ইহুদী রাজা যুনুওয়াসের অত্যাচারে এতটাই অতিষ্ঠ ছিল যে, তাদের সাহায্যে তখন ইথিওপিয়ার খ্রীষ্টান শাসক নাজ্জাশী রোমানদের সহযোগিতায় তার দুই উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা আবরাহা ও আররিয়াতের নেতৃত্বে এক বিশাল সেনা বাহিনী প্রেরণ করেন, যার আক্রমনে ইহুদী রাজা যুনুওয়াস পরাজিত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। 

সেই বিজয়ের মাধ্যমে ইয়েমেনে প্রতিষ্ঠিত হয় নাজ্জাশীর হাবশী শাসন। কিন্তু তার পর পরই তার প্রেরীত শীর্ষ দুই কর্মকর্তা আবরাহা ও আররিয়াতের মধ্যে শুরু হয় ক্ষমতার লড়াই। ইয়েমেনে আপন আপন ক্ষমতা ও আধিপত্য নিরঙ্কুশ করার লড়াইয়ে ছিল হিংসা-বিদ্বেষ ও ষড়যন্ত্রের দারুন জমজমাট প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত আররিয়াতের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লড়াইয়ের চির অবসান হয়। আবরাহা পরিণত হন নাজ্জাশীর আস্থাভাজন জেনারেলে! আবরাহা তার প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য একের পর এক নতুন নতুন কর্ম কৌশলের আশ্রয় নিতে থাকেন!

কে এই জেনারেল আবরাহা? আবরাহা ছিলেন Adulis এর জনৈক রোমান ব্যবসায়ীর দাস! কিন্তু তিনি ছিলেন যেমন সাহসী তেমনি নিষ্ঠুর প্রকৃতির একজন বিকৃত রুচিসম্পন্ন মানুষ। তার উচ্চাভিলাষ ও ক্ষমতার মোহই তার প্রতিদ্বন্দ্বী আররিয়াতকে হত্যায় অনুপ্রাণিত করে, যার ধারাবাহিকতায় তিনি ইয়েমেনের সানা’র গভর্নর নিযুক্ত হন। ক্ষমতা মানুষকে কতটা দাম্ভিক আর উন্মত্ত করে তুলতে পারে, আবরাহাই তার নিকৃষ্টতম উদাহরণ হয়ে ইতিহাসের পাতাকে কলুষিত করে রেখেছে। 

তার হাতে আররিয়াতের মৃত্যুর পর তিনি ভাবতেন, তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী! তার বিরুদ্ধে কথা বলার দুঃসাহস আর কেউ রাখে না। কারণ ইথিওপিয়ার শাসক নাজ্জাশীর আশির্ব্বাদপুষ্ট হয়েই তিনি সানা’র গভর্নর নিযুক্ত হয়েছেন! এই আবরাহাই এক সময় ইয়েমেনের 'রাইহানা' নামক একজন অভিজাত রমনীকে তার স্বামীর কাছ থেকে অপহরণের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছিলেন! তিনি ছিলেন মিথ্যেবাদী, অপকৌশলী ও ধুরন্ধর! সময়মত ও জায়গামত চাটুকারিতায়ও তিনি ছিলেন তুলনাহীন!

৫৪৩ খ্রীষ্টাব্দে গভর্নর আবরাহা নিজেকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবার জন্যে উৎসবের বাহানায় সানা’য় এক সমাবেশের আয়োজন করেন। সেই সমাবেশে রোম, ইরান, হিরা ও গাসসাকের বাদশাহদের প্রতিনিধিগণ যোগদান করায় তার আকাঙ্খা আরও বেড়ে যায়। এবার তার মাঝে ধর্মীয় নেতার সম্মানও ছিনিয়ে নেবার খায়েশ জাগে! আসলে আবরাহা ছিলেন লোভী ও পরশ্রীকাতর। 

মক্কার কা’বা ঘরে আরবের তীর্থ যাত্রীদের যে সমাবেশ হ’তো এবং সেই উপলক্ষে সেখানে মানুষের উপঢৌকন উৎসর্গের যে রেওয়াজ চালু ছিল, সেটাই তাকে বেশী করে আকৃষ্ট করেছিল। সেই সাথে ধর্মীয় উন্মাদনা ও বানিজ্যের সুযোগটাকেও তিনি ছোট করে দেখতেন না। মূলতঃ কা’বা ঘর কেন্দ্রীক ইত্যকার কর্মকান্ডের অনুরূপ কর্মযজ্ঞ তার নেতৃত্বে ইয়েমেনের সানা’য় চালু করাই ছিল তার মনের গহীনে লালিত দুঃসপ্নের রূপরেখা! সেটাই তিনি এবার বাস্তবায়ন করতে চান।

সানা’য় উৎসব আয়োজনের সাফল্যে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি এবার আশাবাদী হয়ে ওঠেন। ইথিওপিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর নামে শুরু করেন এক সুদৃশ্য গীর্জার নির্মাণ কাজ। মূল্যবান সব মার্বেল পাথর ও স্বর্ণ, মনি, মুক্তার সংমিশ্রণে অলংকৃত এমন এক গীর্জা তিনি দীর্ঘ চার বছরের চেষ্টায় নির্মাণ করেন, যা ছিল অতুলনীয়। গীর্জার নাম করণ করা হয় 'আল-কুলাইস'। অথচ চতুর্দিকে প্রচার করা হয় সম্রাট নাজ্জাশীর সম্মানে তৈরী করা হ’লো এই গীর্জা, উদ্দেশ্য নাজ্জাশীর আশির্ব্বাদের ছায়ায় থেকে নিজের স্বপ্ন পূরণ করা। এমন চমৎকার সংবাদে নাজ্জাশী যার পর নাই খুশি ও গর্বিত হন।

এমন কি বাইজেন্টাইনের সম্রাটও অভূতপূর্ব সৌন্দর্য মন্ডিত নয়নাভিরাম চার্চের কথা শুনে দারুন খুশি হন এবং চার্চকে আরও বেশি করে অলংকৃত করার জন্য স্বর্ণ ও মার্বেলের তৈরী অনেক মূল্যবান উপঢৌকন পাঠান। এমন কি আবরাহার জন্য তিনি সম্মান জনক বাইজেন্টাইন পোশাকও পাঠান। আর সেই সাথে নাজ্জাশীকে একথাও বলতে ভোলেন না যে, নাজ্জাশীর নামে নির্মাণকৃত বিশ্ব শ্রেষ্ঠ এই চার্চকে যেন বিশ্ব খ্রীষ্টানদের কেন্দ্রীয় উপাসনালয় হিসাবে ঘোষনা করা হয়। যাতে করে এই চার্চই হতে পারে বিশ্ব খ্রীষ্টানদের মিলন কেন্দ্র। সাথে সাথে আরও জানিয়ে দিলেন যেন, আবরাহাকেই চার্চের কেয়ার টেকার এবং ভবিষ্যৎ ইয়েমেনের সম্রাট ঘোষনা করা হয়।

এতে নাজ্জাশী ভীষণ খুশি হয়ে অনতিবিলম্বে এমন খুশির খবরটা আবরাহাকে জানিয়ে দেন। ফলে স্বপ্ন কার্যকর হতে চলেছে ভেবে আবরাহা নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু ব্যাপক প্রচার সত্বেও মানুষের সাড়া না পেয়ে মনোক্ষুন্নও হন, এবং তিনি ধরেই নেন যে, তার স্বপ্ন পূরণের পথে কা’বা ঘরই প্রধান বাধা। এ প্রসঙ্গে ইবনে ইসহাকের মত হচ্ছে, আবরাহার গীর্জা নির্মাণের উদ্দেশ্য কোন উপাসনা নয়, মক্কার কা’বা থেকে আরব তীর্থ যাত্রীদের বিমুখ করাই ছিল তার মূখ্য উদ্দেশ্য। এমন পরিস্থিতিতে মুহম্মদ খুযাই ও কয়েস নামক আরব গোত্রের দুই ভাইকে তাদের পরিবার পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন সহ চার্চ পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং চার্চ পরিদর্শন কালে আবরাহা তার মনের ইচ্ছাটাকে তাদের কাছে তুলে ধরেন। পাশা পাশি আরবদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার জন্যও তাদের প্রতি আহবান জানান। তার প্রতি সম্রাট নাজ্জাশী ও বাইজেন্টাইনের সম্রাটের যে সমর্থন আছে এবং হেযায ও মক্কার দায়িত্বও যে তার প্রতি অর্পিত হতে যাচ্ছে, সে কথাটিও তিনি বলতে ভুল করলেন না।

Hudhayl গোষ্ঠীর কাছে খুযাই ও কয়েস ভ্রাতৃদ্বয় আবরাহার মনের ইচ্ছাটাকে ব্যক্ত করায় সে গোষ্ঠীরই 'উরওয়া-বিন-হাজিয়াড' প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ হন। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। ফলে যা হবার তাই হ’লো, ভ্রাতৃদ্বয়ের কর্মকান্ড ভীষণ অপছন্দ হওয়ায় নিজের রাগ কে বশ মানাতে না পেরে তীরের আঘাতে তিনি খুযাইকে হত্যা করেন আর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কয়েস কোন রকমে পালিয়ে জান বাঁচায়। তার নিকট থেকে সবিস্তারে ঘটনার বিবরণ শুনে আবরাহা দুঃখিত ও অপমান বোধ করেন এবং উক্ত গোত্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার অঙ্গীকার করেন।

ভিন্ন এক ঘটনায় অন্য একজন বিক্ষুব্ধ আরব পরিদর্শক চার্চ পরিদর্শন করার জন্য অনেক অনুনয়-বিনয় ও প্রশংসা করে চার্চের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পায়। আবরাহার নির্দেশ আসে যেন তাকে বাধাহীন ভাবে, তার ইচ্ছামত চার্চ পরিদর্শন করতে দেয়া হয়। পরিদর্শন শেষে সে ভীষণ কান্না-কাটি শুরু করে দেয় চার্চের ভেতরে একটি রাত অতিবাহিত করার জন্য। তার সে আশাও পূরণ হলে সে ভীষণ খুশি হয় এবং রাত ভরে সে তার ইচ্চামত চার্চের বিভিন্ন বেদীসহ অন্যান্য স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে খুব ভোরেই সেখান থেকে পালিয়ে যায়! পরদিন সকালে চার্চে প্রার্থনা করতে এসে এ রকম একটা দূর্ঘটনায় তারা খুব ব্যথিত ও মর্মাহত হন। আবরাহা তখন এ অজুহাতকে কাজে লাগিয়ে মক্কার কা’বা ঘর ধ্বংশ করার জন্য নাজ্জাশীর অনুমতি লাভের জন্য তার কাছে আবেদন করেন এবং হস্তী বাহিনী সহ বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার কা’বা ঘর ধ্বংশ করার অনুমতি প্রাপ্ত হন।

চক্রান্তকারী আবরাহা এবার তার স্বপ্ন পূরণের জন্য মক্কার কা’বা ঘর ধ্বংশের নক্সা আঁকতে থাকেন। পরিকল্পনা সফল করার জন্য এবার তিনি নাজ্জাশীর দেয়া তেরটি হাতীসহ ষাট হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী নিয়ে যুদ্ধাভিযানের সকল আয়োজন এগিয়ে নিতে থাকেন। এ ঘটনায় তার অহম  বোধ তাকে এতটাই অতি আত্মবিশ্বাসী করে তুলল যে, বিজয় যেন তার নিশ্চিত, এর বাইরে আর কোন ভাবনাই তার মনে আসছিল না। চারিদিকে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ল এমন একটা যুদ্ধাভিযানের কথা। আবরাহার শিবিরে তখন সাজ সাজ রব। এত বড় একটা অভিযান! সফল করার জন্য যাতে কোন ত্রুটি বিচ্যুতি না থাকে তার চুল চেরা বিচার-বিশ্লেষণ, যাচাই-বাচাই চলতে থাকে। কারণ ইতোমধ্যেই আবরাহা ঘোষনা করে দিয়েছেন যে, উদ্দেশ্য সফল না করে তারা ঘরে ফিরবেন না। (চলবে)


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Elephant, Religious, Pilgrims, Attack, Empire, Abraha, Mecca, History