সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

the-warriors-unknown.jpg

হারিয়ে যাওয়া বীরেরা

৪০ হাজার অশ্বারোহী, ৩৩০০ হস্তী, দেড় লক্ষ পদাতিক সৈন্য এবং প্রায় ২০ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গঠিত ছিল এই সালতানাতের সশস্ত্র বাহিনী। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের ইতিহাসে নি:সন্দেহে এটা ছিল সবচেয়ে বড় সালতানাত।

৪৪ বছর ধরে স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বে আমরা পরিচিত হয়ে আসছি। আমাদের আছে নিজস্ব রাষ্ট্র, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সহ নানান অর্জন। এই অর্জনের পেছনে যাদের ত্যাগ, তিতিক্ষার ইতিহাস জড়িত, সেসকল বীরদের আমরা শ্রদ্ধা জানিয়েছি, চেষ্টা করেছি তাদের আশা আকাঙ্ক্ষগুলো যথাসাধ্য পূরণ করতে, তাদের স্থান দিয়েছি মনের মণিকোঠায়।

কিন্তু আমরা ভুলেও গেছি নাম জানা-না জানা হাজারো লক্ষ বীরকে যারা এই ভূমির স্বাধীনতার জন্য শতশত বছর ধরে লড়াই করে এসেছেন। যারা আগ্রাসী নি:শ্বাস থেকে এই পবিত্র ভূমিকে বাঁচাতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন।

নবাব সিরাজদ্দৌলা বা বার ভুঁইয়াদের স্বরণ রাখলেও যাকে আমরা ভুলে গেছি তিনি বাংলার স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কররানী (১৫৭৩-১৫৭৬)। কররানী বা পন্নী বংশ হিসেবে পরিচিত টাংগাইলের এই পরিবারটির পূর্বপুরুষরা মূলত ছিল আফগানি। তবে শত বছরের পরিক্রমায় তারা এই ভুমিতে বাঙালী হিসেবেই স্বাধীনভাবে শাসন করে আসছিলেন।

মূলত সম্রাট ইলতুতমিশের পর থেকেই বাংলা একপ্রকার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে শাসিত হয়ে আসছিল, তবে প্রতিকূল পরিবেশে অনেক শাসক দিল্লীর সুলতানদের হাদিয়া তোহফা দিয়ে খোশামোদ করলেও একমাত্র কররানী বংশই প্রকৃত স্বাধীন শাসক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। আর এই বংশেরই সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হলেন সুলতান দাউদ খান কররানী।

সুলতান দাউদ খান নিজের নামে মুদ্রা ও খুৎবা চালু করেন। মূলত এটা ছিল তখনকার যুগের স্বাধীন সুলতানদের বৈশিষ্ট্য। দুই বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড ও উত্তর ভারতের এক অংশ নিয়ে ছিল এই সুবিশাল স্বাধীন সালতানাত। ৪০ হাজার অশ্বারোহী, ৩৩০০ হস্তী, দেড় লক্ষ পদাতিক সৈন্য এবং প্রায় ২০ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গঠিত ছিল এই সালতানাতের সশস্ত্র বাহিনী। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের ইতিহাসে নি:সন্দেহে এটা ছিল সবচেয়ে বড় সালতানাত।

দিল্লির তৎকালীন মোঘল সম্রাট আকবরের চোখে তাই এই স্বাধীন রাষ্ট্র বিষকাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মুনিম খানের নেতৃত্বে এই রাষ্ট্র দখলের জন্য এক বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু বাঙালীর দেশপ্রেম, বীরত্ব আর কৌশলের কাছে বারবার পরাজিত হওয়ায় আকবর স্বয়ং মানসিংহ ও টোডরমল কে নিয়ে পাটনায় উপস্থিত হন। সাথে নিয়ে আসেন মোঘল সেনাবাহিনীর এক বিশাল বহর। দাউদ খান এবার সাময়িকভাবে পরাজিত হন এবং বাংলা বিহারের এক অংশ মোঘলরা এক কপট শান্তিচুক্তির নামে হাতিয়ে নেয়।

কিছুদিন পর মুনিম খানের মৃত্যু হলে দাউদ আবারো হারানো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করেন। ক্ষুদ্ধ আকবর এবার হোসেন কুলি খানকে খান জাহান উপাধি দিয়ে আবারো বাংলা আক্রমণের নির্দেশ দেন। কিন্তু মোঘল বাহিনী বর্তমান বিহারের তেলিয়াগড়ি গিরিপথে এসে ছয় মাস আটকে থাকে। ছয় মাসের এই যুদ্ধে মোঘল বাহিনী প্রধানসহ হাজার হাজার মোঘল সৈন্য প্রাণ হারায়।

আকবর আবারো দিল্লী থেকে সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু এবার ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতকরা এক বিকল্প রাস্তা দেখিয়ে দেয়। আর প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীরা রাষ্ট্রিয় কোষাগার খালি করে সেনাবাহিনীর বেতন আটকে দেয়। মোঘল বাহিনী এবার সালতানাতের রাজধানী রাজমহল (বর্তমান উড়িষ্যা) অবরোধ করে। শুরু হয় রাজমহলের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ, যা ইতিহাসে মিমাংসাকারি যুদ্ধ হিসেবেও পরিচিত। অবশেষে সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৫৭৬ সালের ১২ই জুলাই দাউদ খান পরাজিত ও আটক হন। হোসেন কুলী খান নিজ হাতে সুলতানের শিরচ্ছেদ করেন।

এভাবে মোঘলদের হাতে বিহার ও উড়িষ্যার পতন হলেও দাউদ খানের শিষ্য ইসা খানের নেতৃত্বে পুর্ব বাংলায় গড়ে উঠে এক বিস্তৃত আন্দোলন, যা ইতিহাসে বার ভুঁইয়া আন্দোলন নামে পরিচিত। সে আরেক লম্বা ইতিহাস। ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক শফিউদ্দীন সরদার রচিত 'শেষ প্রহরী' বইটি আমার জানামতে এই স্বাধীন সালতানাত সম্পর্কে রচিত বাংলায় একমাত্র গ্রন্থ।
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

mughal, bangla, Heroes, Warrior, History